Monday , April 23 2018

আমার মা’কে কষ্ট দেয়া লোকটাকে আমি ডিভোর্স দিতে চাই

মিম্ মি জীবন নিয়ে লড়াই তো চালিয়ে যাচ্ছেন। তাই hats off to you; কিন্তু ছেলের পাসপোর্ট করেছেন কি? ডিবি থেকে ভেরিফিকেশনে এলে বলবে আপনার ঠিকানাতে বাচ্চার ঠিকানা দেয়া যাবে না। ওর বাবার ঠিকানা লাগবে। কারণ আপনি ওর লিগ্যাল গার্ডিয়ান না। ইমিগ্রেশনে আটকাবে। বাচ্চা নিয়ে দেশের বাইরে যেতে বাবার concent letter লাগবে! কারণ আপনি আপনার সন্তানের লিগ্যাল গার্ডিয়ান না… ! এই কথাগুলা বললাম কারণ এই প্রশ্নের মুখমুখি আমি হয়েছি। তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে জানতে চেয়েছি, সন্তান আমি জন্ম দেয়ার পরেও, একা একা লালন পালন করে যাবার পরেও যদি লিগ্যাল গার্ডিয়ান আমি না হই, তাহলে আমি কে?” আমার কোনো এক পোস্টে একজন সিঙ্গেল মা লিখেছেন মন্তব্যটা।

আমি সাধারণত ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো লেখার চেষ্টা না করি ফেসবুকে। কারণ আমার পোস্ট মূলত পড়েন জীবনে কখনো হেরে যেতে হয়েছিল এমন মানুষেরা। আমি চাই না তারা আমার লেখা থেকে এমন কোনো ধারণা গ্রহণ করুক যাতে মনে হয়, জীবন একটা মহা ভেজালের জিনিস। জীবনের ওপর যেন বিরক্ত হয়ে না যায় তারা । তাই খুব সচেতনভাবেই আমি চেষ্টা করি পজেটিভ কিছু লেখার জন্য ইস্যু যাই হোক না কেন। কিন্তু তার মানে এই না যে, আমার জীবনে দুঃখ-কষ্ট-কান্না নেই। কাঁদতে আমাকেও হয় লুকিয়ে লুকিয়ে। সন্তানের জন্য সিঙ্গেল প্যারেন্টের চোখের জলের মতো শুদ্ধ পানীয় পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমিসহ পৃথিবীর সকল সিঙ্গেল প্যারেন্টকেই জীবনে অজস্রবার এই শুদ্ধ জলে ভিজে নিজেকে তৈরি করে নিতে হয় নিত্য নতুন বহু অনাকাঙ্ক্ষিত জীবন যুদ্ধের জন্য। ডিভোর্সের পরে কেন যেন বহু ছেলে/মেয়ে (খুবই কম সংখ্যক মেয়ে) পার্টনারকে ত্যাগ করার সাথে সাথে সন্তানকেও ত্যাগ করে ফেলেন। অথচ ধর্মে এবং সমাজে কিন্তু এই বিষয়ে পরিষ্কার বিধান আছে। তাতে কী? আইনের শাসন! বাংলাদেশে!

আসলে কী হয় জানেন? দায়িত্ব নেবার মতো GUTS কিছু মানুষের কখনোই থাকে না। তারা বিয়ে করতে হয় বলেই করে। সন্তান জন্ম দিতে হয় বলেই দেয়। চাকরি/লেখাপড়া করতে হয় বলেই করে। কখনোই সততা, ডেডিকেশন, প্যাশন দিয়ে তারা কোনো কাজ করেন না। এই স্বভাবের লোকেরা ডিভোর্সের পরে মাথা থেকে সন্তানকেও ঝেড়ে ফেলে দেন। এসব ধ্বজভঙ্গ পুরুষ ধরেই নেয়, আরে যাবে কই? আমারই তো রক্ত। আয় তু তু বললেই ছুটে চলে আসবে সন্তান। আপাতত কিছু বছর চিল মারি। জীবনটাকে এনজয় করি। আর ঐ যে বাতিল করা পুরাতন বৌ সে মানুষ করুক বাচ্চাটাকে। বুঝুক আমার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া এত সহজ না। সন্তানের দেখভাল সবকিছুই ওরে করতে হবে একা একা। না হবে ক্যারিয়ার, না সংসার না স্বপ্ন পূরণ। মেয়ে মানুষের আবার স্বপ্ন!! সমাজও ছিঁড়ে খাবে ওরে। বাচ্চাসহ কোন বোকা পুরুষ (!!) (আসলে সঠিক শব্দটা হবে মহামানব) ওরে গ্রহণ করবে? হুমম এসব ঘটছে নিত্যই। এ ধরনের ঘটনার পরে এক শ্রেণির নারী সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যান জীবন থেকে।

আরেক শ্রেণি প্রাথমিক ঝড়ঝাপটা সামলে বছর দু-একের মধ্যে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ান জীবনের সাথে বোঝাপড়া করবেন বলে। আমাকে যখন জীবনের একটা চ্যাপ্টার ক্লোজ করতে হলো তখন আমি ঘর ছাড়ার সময়ে কিংবা বলা যায় ঘর থেকে বের করে দেবার মুহূর্তে একহাতে একাডেমিক সার্টিফিকেট এবং অন্যহাতে সন্তান এবং পাশে নিজের আব্বু-আম্মু আর বোনদের ভরসা ছাড়া আর কিছু সাথে করে আনতে পারিনি। আমার মায়ের শখ করে সাজিয়ে দেয়া তথাকথিত মাস্টার বেডরুমের এবং আমার ছেলের রুমের জন্য ইন্টার্নশিপের সময় পুরো এক বছরে নিজের বেতনের জমানো টাকা দিয়ে কেনা আসবাবপত্রের একটাও সাথে আনা হয়নি। শখের শোপিচ, ড্রেসিংটেবিলে রাখা টিপের পাতাগুলো, কাচের রেশমি চুড়ি, আলমারিভর্তি কাপড়, ওয়াসরুমের আয়নার সাথে লাগানো LOVE লেখা স্টিকারটাও তুলে ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে আসার সুযোগটুকু পাইনি। সম্ভবতঃ বারান্দাতে তখনো ঝুলছিল আমার চুলের গন্ধমাখা ভেজা টাওয়ালটা। এ রকমই হয় আসলে।

হুট করেই ভেঙে যায় তাসের ঘরগুলো। যেগুলো আসলে সংসার হয়ে উঠতেই পারেনি ইট কাঠের ইমারত ছাড়া। তো ছেলেকে স্কুলে ভর্তির সময়ে সমস্যা হলো। পিতা মাতার NID, পাসপোর্ট সাইজ ছবি জমা দিতে হয়। যখন যথাযথ লোকজনের কাছে এই প্রয়োজনীয় পেপারসগুলো চাওয়া হলো সেসব কিছুতেই পাওয়া গেল না। একবার না বার কয়েক চেষ্টার পরেও যখন কিছুই পাওয়া গেল না তখন বাধ্য হয়ে পুরোনো অ্যালবাম ঘেঁটে পাওয়া গেল শুধু বিয়ের দিনের ছবি। অদ্ভুত দ্রুততায় এক অ্যালবামভর্তি ছবিগুলো টুকরো টুকরো করতে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় একেবারেই লাগেনি। তবে তিনটি ছবি ছেঁড়া হয়নি। বিদায়বেলা বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নার একটি আর বিয়ের শাড়ি পরা সাজুগুজু করা পুতুল পুতুল টাইপ দেখতে ছোটখাটো ভীত মেয়েটির হাসিমাখা মুখের দুটো ছবি। কেন যেন এই ছবি তিনটাতেই আটকে গেল মানুষকে অন্ধভাবে ভালোবাসতে এবং ভরসা করতে জানা মেয়েটি। যাহোক, ডাক্তার হবার বদৌলতে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি সব কাগজ জমা না দিতে পারার পরেও। কিন্তু পাসপোর্ট করা সম্ভব হয়নি এখনো। কিন্তু তাই বলে কি আমরা পৃথিবী দেখব না? অবশ্যই দেখব।

এক পাসপোর্টে কখনোই আমাদের জীবন আটকে যাবে না। যেতে দেইনি আমি। ছেলেকে নিয়ে চষে বেড়াচ্ছি পুরো বাংলাদেশ সুযোগ পেলেই। ছেলেকে বলেছি, বাবা আগে নিজের দেশটাকে দেখো, চিনো। তারপর বড় হলে পুরো পৃথিবীকে দেখবে, চিনবে-জানবে। এখন ছেলে জানে কেন তার পাসপোর্ট নেই। ছেলে এটাও জানে সব ডকুমেন্টস থাকার পরেও কেন তার মা পাসপোর্ট বানায়নি । ছেলে বলে, মা আঠারো বছর হলো তোমার পাসপোর্ট আমি বানিয়ে দিবো। তারপর দুজনে মিলে ওয়র্ল্ড ট্যুর দিবো দেখো। আমার জন্য তুমিও আটকে গেলে পচা সিস্টেমে। ছেলে বলে, মা তুমি তো বলেছিলে কাট্টি তোমাদের দুজনের হয়েছে। আমার সাথে কিছু হয়নি। তাহলে লোকটা, বাবা বলতে কেমন যেন লাগে জানো মা; কেন আমার সাথে যোগাযোগ করল না? নানাভাই, নানু সবার তো মোবাইল আছে। ও ইচ্ছে করে এমন করেছে। ও আমাকেও চায় না। আমি সবই বুঝতে পারি। অনেক বই পড়ি না আমি? ডকুমেন্টারি ফিল্মও তো দেখি আমি।

টিনেজার হবো তো কয়েক বছর পরে। ছেলে আরো বলে, যার চেহারা আমার মনে নেই, যার জন্য আমার মাকে বিশ্রী বিশ্রী প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় অনেক জায়গায়, যার কারণে আমি মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়তে পারি না, নানাভাই না থাকলে তো ঈদগাহে যেয়ে ঈদের নামাজটাও পড়া হতো না, আমার circumcision-এর অপারেশনের পরে যে আমাকে দেখতেও আসেনি, যে কখনো আমাকে চুল কাটতে সেলুনে নিয়ে যায়নি, যে কখনো আমার প্যারেন্টস মিটিংও আসেনি, যার জন্য আমি আমার মাকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে দেখি আমি ঘুমিয়ে যাবার পরে আমাকে কোলে নিয়ে সেই লোকটা কখনোই আমার লিগ্যাল গার্ডিয়ান না। আচ্ছা মা, এই রকম লোককে যারা বেবীদের সাথে যোগাযোগ করে না, বেবীদের মাকে কষ্ট দেয় ওদেরকে বেবীরা ডিভোর্স দিতে পারে না? তুমি ফেসবুকে একটা পোস্ট লিখে দেখো তো। কোনো লইয়ার আন্টি/ আংকেল দেখলে নিশ্চয়ই কমেন্ট করবেন।

গলার কাছে উঠে আসা শক্ত দলাটাকে কোনোরকমে গিলে ফেলে টলমল চোখে নিজের অস্তিত্বের দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে মনে মনে বললাম- প্রকৃতি শোধ নিবেই। আজ না হয় কাল।